বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে সমস্যা কোথায়? – Newfreelancing

0Shares

 

বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে সমস্যা ( outsourcing problems ) হল পেপাল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব, সুলভ মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা না থাকা, উপার্জিত অর্থ উত্তোলনে অসুবিধা।

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সরদের অনলাইনে আয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হল পেপাল।

তার জন্য অনেক বায়ার হারাতে হয় এবং উপার্জিত টাকা উত্তলন করতেও সমস্যা দেখা দেয়।

তাহলে পেপাল একাউন্ট না থাকলে অনেকেই আউটসোর্সিং এর প্রতি অনুৎসাহিত হতে হবে।

 

আউটসোর্সিং কি :

আউটসোর্সিং মানে হচ্ছে- কোন কাজ কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কর্মচারীকে দিয়ে না করিয়ে ওই কাজ বাইরের কাউকে দিয়ে করিয়া নেওয়া।

মূলত ব্যবসায়ীরা কিংবা কোন কোম্পানি আউটসোর্সিং করে।

আসুন একটি উদাহরণের সাথে বুঝার চেষ্টা করি।

মনে করেন, আপনি একটি কোম্পানির মালিক, আর আপনার একটি কাজের জন্য জনশক্তি প্রয়োজন।

কিন্তু, লোকবলের অভাবে ঐ কাজ আপনার নিজের কর্মচারী দিয়ে করিয়ে নেওয়া সম্ভব না।

অথবা, আপনার কর্মচারী দিয়ে করাতে গেলে যে ব্যয় হবে সেটা আপনার বাজেটের থেকে বেশি হয়ে যায়।

তখনই আপনি চিন্তা করলেন একজন বাইরের লোককে দিয়ে এই কাজটি করিয়ে নিবেন কম খরচে।

আপনার সেই কাজের জন্য বিভিন্ন আউটসোর্সিং প্ল্যাটফর্ম রয়েছে।

যেমন, আপওয়ার্ক, ফাইভার, পিপল পার আওয়ার ইত্যাদি।

 

বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে সমস্যা :

নিজের অফিসে বা ঘরে বসে বড় অংশের অর্থ আয়ের সুযোগ থাকায় আউটসোর্সিংয়ে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

দেশে বসে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিদেশের জন্য চুক্তি অনুযায়ী কাজ করাকে আউটসোর্সিং বলা হয়।

আউটসোর্সিং নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন দেশের তরুণ তরুণীরা।

বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে সমস্যা থাকার কারণে বাংলাদেশের উন্নতিতে বাঁধা সৃষ্ঠি হচ্ছে।

বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে সমস্যা গুলো হল-

 

১. পেপাল সমস্যা :

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সরদের অনলাইনে আয়ের ক্ষেত্রে সব থেকে বড় বাধা বা সমস্যা হল পেপাল।

বিশ্বের ১৯০ টা দেশে পেপাল ব্যাবহার করা গেলেও বাংলাদেশে পেপাল ব্যবহার করা যায় না।

এতে করে অনেক বায়ার হারাতে হয় এবং উপার্জিত টাকা উত্তলন করতেও সমস্যা দেখা দেয়।

আমি অনেক ফ্রীল্যান্সারকে চিনি, যারা কাজের অভাবে পড়ে নি।

কিন্তু কাজ করে টাকা বাংলাদেশে আনতে অনেক সমস্যায় পড়তে হয় পেপাল না থাকার কারণে।

এর জন্য পেপাল একাউন্ট না থাকলে অনেকেই আউটসোর্সিং এর প্রতি নিরুউৎসাহিত হতে হয়।

এমন অনেক নামকরা ফ্রিল্যান্সিং সাইট রয়েছে যাদের মেইন মেথডটাই হচ্ছে পেপাল।

কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশে এই সার্ভিস নেই। পেপাল আনা গেলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত হাজার গুণ এগিয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ।

এখন আমাদের ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে দুই তিন দিন পর অপেক্ষা করে টাকা তুলতে হয়।

এটা আমাদের জন্যও সমস্যা, তেমনি বায়ারদের জন্যেও।

বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সিং সাইটের অর্থ লেনদেন হয় পেপাল সার্ভিসের মাধ্যমে।

 

২. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব :

বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে আরেকটি মূল সমস্যা হল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না ঠিকমত।

ঠিকমত বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে বায়ারের কাজ সঠিক সময়ে করা যায় না।

ফলে বায়ার পরবর্তীতে আর অর্ডার দেয় না বাংলাদেশে।

 

৩. সুলভ মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা না থাকা :

আমাদের দেশে যেসব ইন্টারনেট প্রোভাইডার আছে, তাদের কানেকশন এতোটা ভাল না।

যা ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রতিটা সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ।

৫ এমবিবিএস দেওয়ার কথা বলে দেয় ১-২ এমবিবিএস।

এমন কি অনেক সময় কোন ইন্টারনেট থাকে না।

যার জন্য বায়ারের কাজ গুলো সঠিক সময়ে করা যায় না।

ফলে বায়ার পরবর্তীতে আর অর্ডার দেয় না বাংলাদেশে।

এতে বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে সমস্যা দেখা যায়।

 

৪. উপার্জিত অর্থ উত্তোলন করতে গিয়ে সমস্যা :

অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের অর্থ উত্তোলন করা গেলেও উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ব্যাংকগুলো এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সেবা বা সার্ভিস দিতে পারছে না।

তা ছাড়া আউটসোর্সিং করা উপার্জিত অর্থ উত্তোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়।

 

৫. ডলারের দামে পার্থক্য :

বাংলাদেশের টাকার সাথে ডলারের দামে পার্থক্য থাকায় অনেককেই বিভিন্ন সমস্যায় শিকার হতে হয়।

 

৬. ইংরেজি ভাষা :

আউটসোর্সিং মূলত উন্নত দেশ গুলোর বায়ারের সাথে করতে হয়।

বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ভাষা হচ্ছে ইংরেজি।

কিন্তু বাংলাদেশের ভাষা বাংলা হওয়ায় বায়ারের সাথে কথা বলে কাজ বুঝে করা অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়।

 

৭. আইটি খাতে দক্ষতার অভাব :

আউটসোর্সিংয়ে আমাদের যতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটেনি।

এর মধ্যে আইটি খাতে দক্ষতার অভাবকে অন্যতম ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

আইটি খাতে দক্ষতার অভাব থাকার কারণে বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে সমস্যা দেখা যায়।

 

বিবিসি থেকে নেওয়া

জয়িতা ব্যানার্জি ঘরে বসে আউটোর্সিংয়ের কাজ করেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, “অনেক সময় এমন হয় যে, একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি, এর মধ্যে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

এমনও হয় যে ২৪ ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ নেই। তাছাড়া আমাদের দেশে যেসব ইন্টারনেট প্রোভাইডার আছে, তাদের কানেকশন এতোটা ভাল না।

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রতিটা সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমাদের ডেডলাইন চলে আসে।

তখন এ ধরণের সমস্যাগুলো হলে আমাদের বাইরের যে বায়ার আছেন তারা অনেকসময় লিখেই দেয় বাংলাদেশে এসব সমস্যা, আমরা এখান থেকে ফ্রিল্যান্সার নেব না।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ লেনদেনের জন্য পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু না করায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জয়িতা ব্যানার্জি।

বর্তমান বিশ্বে আউটসোর্সিং তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

এখানে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। বেসিস সফটএক্সপো সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

টেকনো বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ ইমরুল কাইস বলেছেন-  আউটসোর্সিংয়ে আমাদের যতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটেনি।

এর মধ্যে ইংরেজি ভাষা এবং আইটি খাতে দক্ষতার অভাবকে অন্যতম ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

 

মিস্টার কাইস বলেন –

“সরকার বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে আউটসোর্সিং খাতের উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সেগুলো সব এন্ট্রি খাতের ওপর ফোকাস করে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু দৃশ্যপট এখন আর আগের মত দেখা যায় না। সবাই এগিয়ে গেছে।

ক্রিয়েটিভিটি, কমিউনিকেশন এবং লজিকাল স্ট্রেংথ অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এজন্য যে প্রশিক্ষণ নেওয়া দরকার সেটা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য।”

বাংলাদেশের অন্তত ২০ লাখ তরুণ তরুণীকে ২০২২ সালের মধ্যে আউটসোর্সিং খাতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।

এই অপ্রতুলতার মধ্যে মাত্র তিন বছরের মাথায় এতো বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা আসলেও কতোটা বাস্তব সম্মত?

সে পরিমাণ অবকাঠামো কি বাংলাদেশের আছে?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানান-  “বর্তমান সরকার ১ লাখ ৭০ হাজার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন বছরের মাথায় ইন্টারনেটে সংযুক্ত করব।

ফোরজি মোবাইল নেটওয়ার্ক জেলা উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।

হাইস্পিড ফাইবার অপটিক কেবল ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

এই অবকাঠামো তৈরি করার জন্যই লক্ষ্য লক্ষ তরুণ তরুণীর কর্মসংস্থান হয়েছে এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে তা আরও বাড়বে বলে আমি আশাবাদী।

এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের অর্থ লেনদেনের সুবিধায় শিগগিরই পেপাল সার্ভিস আনার কথাও জানান প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী।

“অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বাইরে থেকে টাকা আসছে। বিদেশে টাকা পাঠানোর বিষয় নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে আমরা আলোচনা করছি।

আমরা আশা করছি অল্পদিনের মধ্যে ‘ইলেকট্রনিক নো ইওর কাস্টমার’ সার্ভিসটি চালু করতে পারলে পেপাল, স্ক্রি-প্যাল, পেওনিয়ারের মত ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ের ওয়ালেট বাংলাদেশে খোলা সম্ভব হবে।”

প্রযুক্তিবিদ শাহ ইমরুল কাইসও মনে করেন সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় তিন বছরের মাথায় এই চ্যালেঞ্জ চাইলেই পূরণ করা সম্ভব।

“যারা এখন ইন্ডিভিজুয়ালি সাকসেসফুলি কাজ করছে তাদের মাধ্যমে ভাল ভাল কোম্পানিগুলো থেকে কাজ আনা যেতে পারে।

এই কাজগুলো মেডিওকার কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে যেখানে কাজগুলো তাদের ছত্রছায়াতে পরিচালিত হবে।

ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের দিকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তেমনটি আউটসোর্সিং খাতের প্রতি নজর দিলে বড় ধরণের পরিবর্তন আনা যাবে।

 

মন্তব্য :

পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে সমস্যা কোথায়- outsourcing problems সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

এ সমস্যা গুলো সমাধার করলে বাংলাদেশে আউটসোর্সিং বিকাশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পালন করবে।

অতএব, আমার লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টে জানাতে ভূলবেন না।

যদি আমি কোন বিষয় মিস করে থাকি অথবা আপনি আরও কোন বিষয় সম্পর্কে জানতে চান। তাহলে অবশ্যই আমাকে কমেন্ট করে জানাবেন।

এই ধরণের লেখার নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে এবং টুইটারে ফলো করে রাখতে পারেন।

ধন্যবাদ

 

Leave a Comment